বেদেসুন্দরী

বৈশাখের শেষের দিকে নতুন পানি আসতে শুরু করেছে। যৌবনবতী হয়ে উঠছে নদী। তীরবর্তী গ্রামেও নতুন জলের কানাকানি। গল্পের এই নদের নাম আড়িয়াল খাঁ। আড়িয়াল খাঁ নদী নয়—নদ। যদিও একসময়ের খরস্রোতা আড়িয়াল খাঁর বুকজুড়ে এখন বিশাল চর। নদের করালগ্রাসে অনেক ঘর-বাড়ি বিলীন হয়েছে অনেক আগেই। সে অনেক কথা। এখন কথা হচ্ছে—নতুন পানিতে কচি কচি ঘাস হাবুডুবু খাচ্ছে। কাটা ধানের গোড়া তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। ক্রমেই বাড়ছে পানি। স্বচ্ছ টলমলে পানিতে হালকা ঢেউয়ের কাঁপন জাগে। রাত গড়িয়ে ভোরের আলো ফুটতেই পানি যেন বেড়ে যায় হাঁটু সমান।

ভাঙনের পর নদের বুকজুড়ে জেগে ওঠা চরের বুকটাও তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। বোরো ধান উঠে যাওয়ার পর খা-খা করা চরটা বয়স্ক নারীর শুকনো স্তনের মতো মনে হয়। চতুর্দিক থেকে ঢালু হয়ে উপরের দিকে উঠে নারীর স্তনের মতোই দেখায় চরটি। চারদিকের পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সতেজ হয়ে উঠেছে চরের ঘাস, লতা-গুল্ম। কিছুদিন পরেই চরে নৌকা নামবে। লগিতে নৌকা আটকে মাছ ধরার উৎসব শুরু হবে।

 

কেমন একটা বর্ষা বর্ষা ভাব এসে গেছে চরজুড়ে। স্তনবৃন্তের মতো একটি ঘর কেবল দাঁড়িয়ে আছে চরের উঁচু স্থানটিতে। সন্ধ্যার পরে যখন প্রদীপের আলো জ্বলে ওঠে; তখন ওটাকে পরীর দ্বীপ বলে মনে হয়। ভরা বর্ষায় থৈ থৈ পানির মধ্যে এক চিলতে আশা নিয়ে জেগে আছে বাড়িটি।

পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নৌকার জোগাড়-যন্তর চলতে থাকে গ্রামজুড়ে। এখানে বৈদ্যুতিক আলো নেই। যোগাযোগের রাস্তা-ঘাট নেই; নৌকাই মানুষের একমাত্র ভরসা। বৈশাখের এই শেষ সময়টায় চলতে থাকে বর্ষা যাপনের প্রস্তুতি। ক্ষরা মৌসুমে খসখসে ভূমি থেকে যে ফসল মেলে, তা জিইয়ে রেখেই চলে কৃষকের আগামীর সংসার। বর্ষা এলে হয় পেশার বদল। কৃষিকাজ ফেলে শুরু হয় মাছ ধরা।

পদ্মার অববাহিকায় সৃষ্ট আড়িয়াল খাঁয় মাছও আসে প্রচুর। ইলিশ, বোয়াল, চিতল, আইড় থেকে শুরু করে মলা, ঢেলা, শিং, মাগুর, কালিবাওস, চিংড়ি, পুটি, লাউয়া, টাকিসহ নানান কিসিমের মাছ আসে জেলের জালে। নিম্নবিত্ত শ্রেণির কাজই তখন মাছ ধরা। কিঞ্চিত চাকরিজীবী বা ব্যবসায়ীরা হন সেই মাছের খরিদ্দার। সারারাত মাছ ধরে সকালে গ্রামের শেষ মাথায় বসে অস্থায়ী মাছের হাট। জেলেদের ধরা মাছেই উদরপূর্তি হয় গেরস্থের।

পানিও বাড়ে, মাছও বাড়ে। বাড়ে জেলের সংখ্যাও। রাতের চরটি আলোকিত হয়ে যায় প্রদীপের আলো পেয়ে। হারিকেন বা কেরোসিনের বাতি জ্বলে প্রতিটি নৌকায়। যারা নিরাক চায়; তাদের হাতে থাকে টর্চলাইট। এতো এতো নৌকা থাকার পরেও চরজুড়ে সুনসান নিরবতা। মাঝে মাঝে ঝুপঝাপ শব্দ ছাড়া মানুষের কণ্ঠ তেমন মেলে না। বর্ষা এলেই যেন যৌবন ফিরে পায় চরটি। প্রতিবার একই দৃশ্য চোখে পড়ে সবার। এ যেন ব্যতিক্রম হওয়ার নয়।