জগতে আনন্দযজ্ঞে ছড়ার নিমন্ত্রণ
- In -- শিল্প ও সাহিত্য --
- Jan 31, 2021 --
ছড়ার ভাষা: খুকুমণির ছড়া থেকে তেলের শিশি
‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো
বর্গী এলো দেশে,
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেবো কিসে?
ধান ফুরালো পান ফুরালো খাজনার উপায় কী?
আর ক’টা দিন সবুর করো
রসুন বুনেছি।’ নবাব আলীবর্দী খাঁর শাসন আমলে, ১৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে বর্গী হামলার সময়ে রচিত হয়েছিল ঐতিহাসিক এই ছড়াটি। বর্গী হামলার খবরের পাশাপাশি একই সঙ্গে ছড়াটি জানিয়ে দিচ্ছে তৎকালীন সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামর্থ্য আর অসামর্থ্যরে কথাও। গরিব অসহায় হতদরিদ্র প্রজা সব খুঁইয়েছে বর্গী হামলায়। উৎপাদিত শস্র-ধান-পান সবই ফুরিয়ে একেবারেই নিঃস্ব প্রজা। কিন্তু তাতে কি? রাজা বা জমিদারকে (শাসক) খাজনা বা ট্যাক্স তো দিতেই হবে। নইলে পাইক পেয়াদা এসে ধরে নিয়ে যাবে। অমানুষিক নির্যাতন করবে। নিঃস্ব প্রজা তাই পরবর্তী শস্য উৎপন্ন হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার আকুল আবেদন জানাচ্ছে, কারণ সে রসুন বুনেছে। এই রসুন বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকায় কিংবা সরাসরি রসুনগুলোই খাজনা হিসেবে সমর্পণ করবে সে। গরিব প্রজা খেতে পেলো কি পেলো না, উপোস দিলো কি দিলো না সেটা দেখা তো রাজা বা শাসকের কাজ নয়। তার দরকার খাজনা- কী ভয়াবহ সমাজচিত্র! এই ঘটনার প্রায় আড়াইশ বছর পরেও আমরা দেখি সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশের গরিব কৃষক অত্যাচারী রাজার নিষ্ঠুর নিপীড়নের শিকার হয়ে স্বীকার করছে, ‘বাকি রাখা খাজনা/মোটে ভালো কাজ না/ভর পেট না-ও খাই/রাজ কর দেওয়া চাই/যায় যদি যাক প্রাণ/হীরকের রাজা ভগবান।’
আধুনিক বিশ্বে অত্যাচারের ধরন পাল্টালেও শোষকের চরিত্র পাল্টায়নি। আর তাই আমরা দেখছি ছড়ার চরণ পাল্টালেও ধরন (প্রেক্ষাপট)পাল্টায়নি।
সময়ের সাক্ষী ছড়া। ক্ষদ্রায়তনের একটি ছড়ার ছোট্ট ক্যানভাসে আঁকা থাকে হাজার বছরের ইতিহাসের বিপুল বিশাল অবিনাশী চিত্র। সাত পৃষ্ঠা লিখে যা বোঝানো হয় ছড়ায় সেটা সাত লাইনেই সম্ভব। আগেই বলেছি, ছড়া ছোট কিন্তু লক্ষ্যভেদি। ছোটগল্পের ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে ‘গোস্পদে আকাশ দেখা’। ছড়ার ক্ষেত্রে ছোটগল্পের এই ক্ষমতাটির পাশাপাশি উল্টোটাও অর্থাৎ কিনা আকাশে গোস্পদের চিহ্নও অবলোকন করা সম্ভব। অর্থাৎ ছড়ার রয়েছে বহু দূর থেকে দেখা কিংবা একেবারে কাছে থেকে দেখার অদ্ভুত ক্ষমতা। ছড়ার আছে খুবই পাওয়ারফুল একটা লেন্স। যা দিয়ে ‘জুম ইন জুম আউট’ করে আপনি অতীত বর্তমান এবং কখনো কখনো ভবিষ্যৎও দৃশ্যমান করে তুলতে পারেন। আমি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাবার পর অভিনেতা আফজাল হোসেন আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে ডান হাতের দুই আঙুলে ছোট্ট একটা স্পেস নির্দেশ করে বলেছিলেন, ‘তুমি হচ্ছো সেই খেলোয়াড় যাকে খেলতে হয় এই এতোটুকুন একটা মাঠে। এবং এইটুকুন স্পেসেই তোমাকে তোমার যাবতীয় ক্ষমতা আর দক্ষতাকে প্রকাশ করতে হয়। খেলাটা সহজ নয়। সামান্য স্পেসে বড় খেলা দেখাতে হলে মারাত্মক স্কিল্ড হতে হয়। সেই কারণেই তুমি সবার থেকে আলাদা।’ অভিনেতা আফজাল হোসেনের কথাটা আমার পছন্দ হয়েছিল। কারণ তিনি ছড়া সম্পর্কিত নিগূঢ় সত্যটিই উচ্চারণ করেছিলেন। ক্ষুদ্রায়তনে বিপুল শক্তির আধার, ছড়া। সমাজ-ইতিহাসের স্বরূপ আমরা প্রত্যক্ষ করি ছোট্ট ছড়ার বিশাল জানালা দিয়ে। কিছু ছড়া পুরোনো হয় না। কাল সে জয় করতে পারে। একটি কালজয়ী ছড়ার কথা বলি:
‘খোকন খোকন ডাক পাড়ি
খোকন গেলো কার বাড়ি?
আয় রে খোকন ঘরে আয়
দুধ মাখা ভাত কাকে খায়।’ বর্তমানের কিংবা আগামী দিনের পাঠক নাম না জানা ছড়াকারের এই ছড়াটি পাঠ করে অনায়াসেই বুঝতে পারবে যে, ছড়ায় বর্ণিত এই খোকন সে নিজে। যে মা তাকে ডাকছে, সেই মা হচ্ছে জননী জন্মভূমি। যে দুধ মাখা ভাতের কথা বলা হয়েছে, সেই দুধ মাখা ভাত হচ্ছে তার দেশের সম্পদ। যে কাকের কথা বলা হয়েছে সেই কাক হচ্ছে অপশক্তি আর অসুন্দরের প্রতীক। সেই অপশক্তি আর অসুন্দরের হাত থেকে মা-কে রক্ষা করতে, দুধমাখা ভাতগুলো রক্ষা করতে সন্তানের প্রতি মায়ের আকুল আহ্বান হচ্ছে এই ছড়া। দেশের দুর্যোগে দুঃসময়ে যুগে যুগে ছড়াকাররা ছড়ার ভাষায় এভাবেই ডাক দিয়ে যায়। ইতিহাস সাক্ষী, ছড়াকার ডাক দিয়ে যায়।
1729344490.jpg)
1576306355.gif)
1576304475.gif)